আমার যাত্রা: বাংলার ছোট্ট গ্রাম থেকে বিশ্বে
মূল লেখাটি ইংরেজিতে; ইংরেজিতে পড়ুন।
গলিগ্রাম, পূর্ব বর্ধমান
গলসি হাই স্কুল, বাংলা মাধ্যম, ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত
নরেন্দ্রপুর, কলকাতা
রামকৃষ্ণ মিশন রেসিডেনশিয়াল কলেজ
চেন্নাই
MSc কেমিস্ট্রি, IIT Madras
অ্যারিজোনা, USA
PhD শুরু, Arizona State University
স্টকহোম, সুইডেন
PhD শেষ, Stockholm University
এডিনবরা, স্কটল্যান্ড
Postdoctoral researcher, University of Edinburgh
লিংকন, ইংল্যান্ড
স্থায়ী পদ, University of Lincoln (২০২২)
আমার জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার (এখন পূর্ব বর্ধমান) ছোট্ট একটা গ্রাম, গলিগ্রামে। খুব সাধারণ পরিবারে বড় হয়েছি, আর ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত পড়েছি গ্রামের বাংলা-মাধ্যম স্কুল গলসি হাই স্কুলে। তখন আমার কোনো ধারণাই ছিল না, পড়াশোনা আমাকে শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাবে।
স্কুলের পর পড়তে গেলাম কলকাতার কাছে রামকৃষ্ণ মিশন রেসিডেনশিয়াল কলেজ, নরেন্দ্রপুরে। সেটা ছিল আমার জীবনের একটা বড় মোড়। পড়াশোনা, থাকা আর খাওয়া মিলিয়ে মাসে খরচ ছিল মাত্র ₹১,১০০। আমার মতো সাধারণ পরিবারের ছেলের কাছে উচ্চশিক্ষা সম্ভব হয়েছিল ওই সুযোগের জন্যই।
নরেন্দ্রপুর থেকে চেন্নাইয়ের IIT Madras-এ গেলাম কেমিস্ট্রিতে MSc করতে। পরে GRE আর TOEFL পরীক্ষা দিয়ে আমেরিকার Arizona State University-তে PhD শুরু করলাম। আমার রিসার্চ সুপারভাইজার যখন সুইডেনের Stockholm University-তে চলে গেলেন, আমিও তাঁর সঙ্গে গেলাম, আর সেখানেই PhD শেষ করলাম।
তারপর স্কটল্যান্ডে, University of Edinburgh-এ postdoctoral researcher হিসেবে যোগ দিলাম। ২০২২ সালে ইংল্যান্ডের University of Lincoln-এ স্থায়ী পদে কাজ শুরু করি। আজ UK-ই আমার ঘর।
পেছনে তাকালে মনে হয়, গ্রামের একটা ছোট বাংলা-মাধ্যম স্কুল থেকে ভারত, আমেরিকা, সুইডেন আর UK-র বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত — যাত্রাটা সত্যিই অসাধারণ। কিন্তু আমি মনে করি না আমার গল্পটা আলাদা কিছু। গ্রামে আর ছোট শহরে অসংখ্য ছেলেমেয়ে বড় হচ্ছে, যারা ঠিক ততটাই মেধাবী, কৌতূহলী আর উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তাদের যা প্রায়ই থাকে না, তা হল তথ্য, সঠিক দিশা, আর এমন মানুষ যাঁরা দেখিয়ে দিতে পারেন কী কী সম্ভব।
বিশ্বপাঠ (BiswaPath) শুরু করার এটাই একটা বড় কারণ।
আমি চাই ছাত্রছাত্রীরা — বিশেষ করে সাধারণ পরিবারের আর বাংলা-মাধ্যম থেকে আসা ছেলেমেয়েরা — জানুক যে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, গবেষণা করা বা বিদেশে পড়তে যাওয়া তাদের নাগালের বাইরে নয়। সুযোগ আছে, স্কলারশিপ আছে, আলাদা আলাদা পথ আছে। কিন্তু কোথা থেকে শুরু করতে হবে না জানলে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন।
আমি এটাও বিশ্বাস করি যে শিক্ষা মানে শুধু বাড়ি ছেড়ে অন্য দেশে থিতু হওয়া নয়। কেউ হয়তো ভারত বা বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে নিজের এলাকার জন্য কাজ করবে। কেউ আবার আমার মতো বিদেশে জীবন গড়বে। দুটো পথই সমান মূল্যবান। আসল কথা হল, আমাদের শিক্ষা, জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা কী পরিবর্তন আনতে পারি।
বিশ্বপাঠের মাধ্যমে আমি সারা পৃথিবীর ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, গবেষক, অধ্যাপক আর পেশাদারদের এক জায়গায় আনতে চাই। আমরা অনেকেই আলাদা আলাদা পথে হেঁটেছি, একই রকম অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছি, আর পথে অনেক কিছু শিখেছি। সেই অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলে পরের প্রজন্মের যাত্রাটা একটু সহজ হতে পারে।
আমি একা এটা করতে পারব না, আর আমি চাই না বিশ্বপাঠ শুধু আমার ব্যক্তিগত প্রকল্প হয়ে থাকুক। আমার আশা, ধীরে ধীরে এটা একটা সম্মিলিত, সবাই মিলে গড়া শিক্ষার উদ্যোগ হয়ে উঠবে — যেখানে মানুষ একে অপরকে সাহায্য করবে, নির্ভরযোগ্য তথ্য ভাগ করবে, আর এমন ছাত্রছাত্রীদের জন্য সুযোগ তৈরি করবে, যারা হয়তো অন্যথায় সেগুলোর কথা কোনোদিন শুনতেই পেত না।
আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলার একটা ছোট গ্রাম থেকে। বিশ্বপাঠ আমার একটা চেষ্টা — যাতে অন্যরাও খুঁজে পায়, তাদের নিজের যাত্রা তাদের কতদূর নিয়ে যেতে পারে।
ড. সুমিত কোনার
প্রতিষ্ঠাতা, বিশ্বপাঠ (BiswaPath)
আপনিও কি এমন পথে হেঁটেছেন? আপনার গল্প ভাগ করুন, বা সবে শুরু করা কোনো ছাত্রকে সাহায্য করুন। বিশ্বপাঠে যুক্ত হোন